খুলনা

কুষ্টিয়ায় সার সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি পেঁয়াজ চাষিরা

  প্রতিনিধি ৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:০০:২৬ প্রিন্ট সংস্করণ

হৃদয় রায়হান কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি

গত বছরজুড়ে পেঁয়াজের ভালো দাম ছিল বাজারে। মৌসুমের শুরুতে ৩৫-৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরের বেশির ভাগ সময়ে বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১৩৫ টাকা কেজি। সেই পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে। আর প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকা। গত মৌসুমে ভালো মুনাফা করায় চলতি মৌসুমেও পেঁয়াজ আবাদে আগ্রহ দেখা গেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চাষিদের মাঝে। মাঠে মাঠে পেঁয়াজের চারা রোপণের ধুম পড়েছে। তবে চাহিদামতো সার না পাওয়ায় বিপদে পড়েছেন কৃষক।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে চাহিদামতো নন ইউরিয়া টিএসপি, এমওপি এবং ডিওপি সার পাওয়া যাচ্ছেনা। কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেশি গুণলেই সাব ডিলার ও খোলাবাজার থেকে চাহিদামতো সার মিলছে।

কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় কৃষিজমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে চার হাজার ৯২০ হেক্টর জমি পেঁয়াজ চাষাবাদের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে তিন হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা, পেঁয়াজ আবাদে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, কয়েক বছর আগেও এ উপজেলায় শুধু শীতকালীন পেঁয়াজ আবাদ হতো। এখন অসময়ে ভালো দাম পাওয়ায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষাবাদ করছেন কৃষকরা। এ বছর ১৭৪ হেক্টর জমিতে নাসিক এন ৫৩ জাতের পেঁয়াজের চাষ করেছেন কৃষক।

কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জমি ভাড়া, বীজ, সার, চাষ ও পরিচর্যা বাবদ এ বছর প্রতি হেক্টরে খরচ পড়ছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। তবে সারের কোনো সংকট নেই।
সোমবার দুপুর থেকে যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট, নন্দলালপুর ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে ঘুরে দেখা যায়, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সী ২০ থেকে ৩০ জন দলবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন। তারা জানান, চারা রোপণের ভরা মৌসুমে শ্রমিকের চরম সংকট থাকে। এ সময় পান্টি ইউনিয়নের ভালুকা গ্রামের ইশাক আলীর ছেলে লাল্টু আলী শেখ বলেন, গেল বছরজুড়েই পেঁয়াজের ভালো দাম ছিল। প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। সে জন্য মানুষ অন্যান্য ফসল চাষ বাদ দিয়ে পেঁয়াজ চাষ করছেন। কিন্তু চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছেনা। তিনি জানান, তিন বিঘা জমিতে এবার পেঁয়াজের চারা রোপণ করেছেন তিনি। জমিতে পরিমিত সার দিতে পারেননি।

ভালুকা পূর্বপাড়া গ্রামের মৃত আবু দাউদ শেখের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করছি। ডিলার লাইন ধরিয়ে ন্যায্যমূল্যে ১০-২০ কেজির বেশি সার দিচ্ছেন না। সাব ডিলাররা বস্তা ধরে সার দিচ্ছেন। ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সাব ডিলারদের মাধ্যমে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে। তারা বস্তাপ্রতি ৫০০-৭০০ টাকা বেশি নিচ্ছে।
যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের জহির হোসেনের ছেলে আবু বাদশা অভিযোগ করে বলেন, বিঘাপ্রতি ১০ কেজির বেশি সার দেয়না ডিলার। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে সার কেনা হচ্ছে। এতে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোলাবাজারে এক হাজার ৩৫০ টাকা সরকারি মূল্যের এক বস্তা টিএসপি সার এক হাজার ৮৫০ থেকে দুই হাজার টাকা, এক হাজার ৫০ টাকা বস্তার ডিএপি সার এক হাজার ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং এক হাজার টাকা মূল্যের প্রতি বস্তা এমওপি সার এক হাজার ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পান্টির পূর্বাশা ক্লাবমোড় এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে সাগর হোসেন বলেন, আমরা কৃষক মানুষ। সারের জন্য চিন্তা করতে চাইনা। সরকার যেন সারের বিষয়টি নিশ্চিত করে কৃষকের জন্য।
পান্টি ইউনিয়নের বেলতলা এলাকার বিসিআইসির সাব ডিলার কুদ্দুস উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগটি সঠিক নয়। আগে ডিও কিনে অবৈধ সারের ব্যবসা করতাম। কিন্তু এ বছর সব বাদ দিয়ে সঠিক নিয়মে ব্যবসা করছি।

কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি খন্দকার আব্দুল গাফফার। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার দিচ্ছেনা সরকার। মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেও সারের জোগান হয়নি। ফলে কৃষকদের চাহিদামতো সার দিতে পারছেনা ডিলাররা। কোনো ডিলার অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছেনা বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সাব ডিলার ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন স্থান থেকে সার সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করছে। এদের আইনের আওতায় আনা দরকার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ন্যায্যমূল্যে সার বিক্রি করা হচ্ছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি দামে সার বিক্রি করছিল। অভিযান চালিয়ে তাদের জরিমানা করা হয়েছে।
সার নিয়ে ডিলাররা কোনো সিন্ডিকেট করলে তা ক্ষতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, কৃষকরা যেন সরকারি দামে এবং চাহিদা অনুযায়ী সার পায়, সেই লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে প্রশাসন।

আরও খবর

Sponsered content